এবার ভাড়ার টাকায় নিজের বাড়ি

মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট ক্রয় করার জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিবেন

মো: শফিউল ইসলাম রায়হান | প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২১ ১৪:০৩; আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ১৫:৪৬

মধ্যবিত্তদেরও রয়েছে ফ্ল্যাট ক্রয় করার সুযোগ। এ জন্য কেবল জানতে হবে আর প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রথমে জেনে নেওয়া প্রয়োজন মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার মত জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। একটা ফ্ল্যাট ক্রয় করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সারা জীবনের আয়ের একটা বড় অংশ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।যে সকল মধ্যবিত্ত পরিবার ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম এর মত বড় শহরে ভাড়া় বাসায় দীর্ঘদিন অতিবাহিত করতে হবে বা হচ্ছে তাদের জন্য সামর্থের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করে একটি ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবশ্যই ফ্ল্যাট ক্রয়ের দিকে যাওয়া উচিত।

কারণ ঢাকা শহরে বসবাসরত মধ্যবিত্ত প্রতিটি পরিবারের মাসিক আয়ের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ টাকা বাসা ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে যাচ্ছে। একটা সাধারণ হিসাবে দেখা যায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ২০ বছরে যে ভাড়ার  টাকা গুনতে হয় তা একটি মাঝারি আকৃতির ফ্ল্যাটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ টাকা খরচ হয়ে যায় । এতগুলো টাকা কে খরচের খাতে না ফেলে একটা ভালো পরিকল্পনা করে বিনিয়োগের খাতে নেওয়া যেতে পারে। 

 মোঃ শফিউল ইসলাম রায়হান

একটি ফ্ল্যাটের মূল দামের ২০% টাকার ব্যবস্থা করতে পারলে এবং প্রতি মাসে যে টাকা ভাড়া দিচ্ছেন তার চেয়ে কিছুটা বেশি ব্যাংকে কিস্তি দেওয়া মাধ্যমে একটি ফ্ল্যাট কেনার চিন্তা করা যেতে পারে। মনে করুন একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড়ে প্রতি বছর ২ লক্ষ টাকা ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে থাকে। প্রতিটা পরিবারের জীবন ধারার উপর ভিত্তি করে  কমবেশি হতে পারে। এই ভাড়ার টাকা ২০ বছর যাবত গুনতে হলে মোট ৪০ লক্ষ  টাকার অনেক বেশি খরচ হয়ে যায়। কারণ প্রতি দুই থেকে তিন বছর পর পর ভাড়া বৃদ্ধি পায়। সে হিসাবে খরচের পরিমাণ আরো বেশি হবে।

এই  সমপরিমাণ টাকা আপনি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কিস্তির মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ে পরিশোধ করে ফ্ল্যাট ক্রয় করতে পারেন। আপনি যদি একটি রেডি ফ্লাট ব্যাংকের মাধ্যমে লোন নিয়ে ক্রয় করেন এবং প্রত্যেক মাসে যে টাকা ভাড়া দিচ্ছিলেন তার সাথে অল্প কিছু টাকা যোগ করতে পারেন তবে একটা নির্দিষ্ট সময়ে় পর কিস্তি শেষ হয়ে যাবে তখন পুনরায় প্রত্যেক মাসের কিস্তির টাকা নতুন ভাবে সঞ্চয় করতে পারবেন এবং যে ফ্ল্যাট আপনি ক্রয় করেছেন সেই সময় তার বিক্রয় মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এই সহজ হিসাবটা ঢাকা শহরে বসবাসরত অনেক ব্যক্তিবর্গ বুঝতে পারেন না। অনেকের এই সহজ বিষয়টি জানা থাকলেও একটি রেডি ফ্লাট বুকিং করার জন্য যে পরিমাণ টাকা গুনতে হয় তা দেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকায় এবং পারিপার্শ্বিক অনেক বিযয়ের জন্য বছরের পর বছর ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এমনকি উনার পরবর্তী প্রজন্ম ও একইভাবে বছরের পর বছর ভাড়া দিতে হবে। 

 

মূলত তিনটি বিষয় একজন ক্রেতা বা বিনিয়োগকারী ব্যবস্থা করতে পারলে একটি গর্বিত ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন।

প্রথমতঃ একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ফ্ল্যাটের মূল দামের কমপক্ষে ২০ শতাংশ টাকার ব্যবস্থা করা। অনেক ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ লোন দিয়ে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার মতো কোন চাকরি বা ব্যবসা  থাকতে হবে। অবশ্যই ঢাকা শহরে যারা প্রতিমাসে ভাড়া দিচ্ছেন তাদের কোনো না কোনো চাকরি বা ব্যবসা রয়েছে। তবে চাকুরী ব্যবসার যাই থাকুক ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী আপনি লোন পাওয়ার মত যোগ্যতা থাকতে হবে।

তৃতীয়তঃ প্রতি মাসে যে ভাড়ার টাকা দিচ্ছেন তার সাথে আরো কিছু টাকা যোগ করে লোন পরিশোধ করার সামর্থ্য। মূলত তিনটি বিষয় একজন মধ্যবিত্ত ব্যক্তির থাকলে এবং সঠিক পরিকল্পনা ও গাইড লাইন নিয়ে উনি অবশ্যই একটি সুন্দর স্বপ্নের ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। কিছু ব্যক্তি আপনাকে ধারণা দিতে পারে ফ্ল্যাট ক্রয় বাবদ এতগুলো টাকা বিনিয়োগ না করে সঞ্চয় পত্র অথবা কোন ব্যাংকের ডিপোজিট রেখে ইন্টারেস্ট গ্রহণ করতে পারেন।

বর্তমানে ব্যাংক ইন্টারেস্ট হার পূর্বের তুলনায় অনেক কম এপ্রিল ২০২০ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ ইন্টারেস্ট পাওয়া যাবে। এছাড়া যাদের প্রতি মাসে বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে এবং ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার সুবিধা আছে তাদের জন্য সঞ্চয় পত্র অথবা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে ইন্টারেস্ট উপভোগ করার চেয়ে ফ্ল্যাট কিনাটাই অধিক সুবিধাজনক।

যে সব এলাকায় আর্থসামাজিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন অধিকতর দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ওই সকল এলাকায় মাত্র দুই তিন  বছরে মধ্যে ফ্ল্যাটের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। তবে কোন এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম আগামীতে কেমন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তা একজন রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট মার্কেট রিসার্চ, এনালাইসিস, অবজারভেশন এর উপর ভিত্তি করে সঠিক ধারণা দিতে পারবেন।

 

লেখকের আরো লেখা পড়তে : এই সময় আবাসন খাতে বিনিয়োগ অধিক লাভজনক

উপরের আলোচনা মূলত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা ফান্ড কালেকশন বিষয়ে ধারণা দেওয়া হলো। অনেকের ধারণা শুধুমাত্র টাকা বা  প্রয়োজনীয় ফান্ড কালেকশন হলেই সহজেই ফ্ল্যাট কেনা যাবে। বিষয়টা মোটেও সঠিক নয়। বিগত দিনে অনেকে ক্রেতা বা বিনিয়োগকারীর কেইস স্টাডি করে লক্ষ্য করা গেছে অনেকে ফ্ল্যাট কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও পরিপার্শিক অনেক বিষয়ের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে ঝামেলা মুক্তভাবে ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না। সঠিক নিয়মে ফ্ল্যাট কেনার প্রক্রিয়া টি বেশ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে করতে হয়। যেমন ধরেন সঠিক উপায় বিক্রয়যোগ্য ফ্ল্যাটের ডাটা কালেকশন করা, হোম ইনস্পেকশন মেনটেইন করে প্রজেক্ট ভিজিট, রিয়েল এস্টেট পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ফ্লাট ভ্যালুয়েশন,ডকুমেন্টেশন চেক, রেসপন্সিবল নেগোসিয়েশন, কমন এরিয়ার হিসাব, সেলস পারমিশন, বিক্রয় চুক্তিনামা সম্পাদনা, রেজিস্ট্রেশন, মিউটেশন ইত্যাদি। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে একজন রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট এর সহযোগিতায় নেওয়া প্রয়োজন।

ফ্ল্যাট ক্রয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একজন পেশাদার রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট এর মাধ্যমে না নিলে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে এই সব জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিছু বিষয় আপনি একজন আইনজীবী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যাংকারের মাধ্যমে সহযোগিতা পেতে পারেন কিন্তু পুরো রিয়েল এস্টেট মার্কেট রিসার্চ এবং অবজারভেশন করে একজন ক্রেতার সকল অধিকার বুঝে নিয়ে ঝামেলামুক্ত ভাবে ফ্লাট খোঁজা থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন এমনকি নামজারি পর্যন্ত সার্বিক সহযোগিতার জন্য এক জন বিনিয়োগ পরামর্শকারী আপনার পাশে অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। মধ্যবিত্তের একটা অংশ সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কখনোই ফ্ল্যাট কিনতে পারবে না কারণ বর্তমান সমাজে দিনে দিনে শো অফ কালচার এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যার ফলে অনেকের সঞ্চয় এর একটা বড় অংশ ফ্যাশন বা বিনোদনে খরচ হয়ে যাচ্ছে।

এমনকি অনেকে ফ্ল্যাট না কিনে প্রথমে একটা গাড়ি কিনে আরো অতিরিক্ত খরচের ভার বহন করতে হয় যা নিতান্তই উচ্চবিত্তের সাথে সামাজিক মর্যাদার ভারসাম্য মিলানোর এক চরম বোকামি। কষ্ট অর্জিত অর্থ দিয়ে অবশ্যই প্রথমে মৌলিক চাহিদা পূরণের দিকেই লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। কেবলমাত্র  সঠিক নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনায় ফ্ল্যাট ক্রয়ের মাধ্যমে নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন। একটি ফ্ল্যাট পরিকল্পিতভাবে ক্রয় করার মাধ্যমে শুধুমাত্র এই শহরে বসবাস করার আশ্রয়স্থল নির্মাণ করলেন এমন নয় বরং এই সম্পত্তিটি আপনাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আর্থিক, সামাজিক এবং মানসিকভাবে প্রশান্তি দিয়ে নান্দনিক জীবনযাত্রার বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : রিয়েল এস্টেট পরামর্শক, rayhan8484@gmail.com

 

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর

যোগাযোগ: বাসা- বি-৬২ (৩য় তলা) , রোড: ৩, ব্লক: বি, নিকেতন, গুলশান-১, ঢাকা-১২১৩

মোবাইল : ০১৭১৯০২৩৮০৩

ইমেইল : extraprbd@gmail.com

Developed with by
Top